অস্ত্রসহ যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে কমলা হ্যারিসের বাসভবন থেকে

প্রকাশিত: ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২১

অস্ত্রসহ যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে কমলা হ্যারিসের বাসভবন থেকে
নিউজ ডেস্কঃ  আশঙ্কাই সত্যি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় উসকে ওঠা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা নানা ধরনের হামলার সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদীর হামলায় জর্জিয়ায় আটজনের প্রাণ যাওয়ার পর বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের বাসভবনের বাইরে থেকে অস্ত্রসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসের অদূরে ব্লেয়ার হাউসে বসবাস করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। বুধবার দুপুরে তাঁর বাড়ির সামনে একজন সন্দেহজনক লোকের অবস্থান শনাক্ত করে গোয়েন্দা বিভাগ। ৩১ বছর বয়সী পল মারি নামের এই ব্যক্তি টেক্সাসের স্যান অ্যান্টোনিওর বাসিন্দা। প্রথমে তাঁকে সন্দেহবশত গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর গাড়িতে বড় ধরনের হামলার অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন কোনো না কোনো বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব হামলায় ট্রাম্পের বেপরোয়া সব মন্তব্য ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সহিংসতা মার্কিন সমাজকে নতুন করে অস্থির করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

এক বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এশিয়ান-আমেরিকানদের ওপর বিদ্বেষপূর্ণ হামলার ঘটনা বাড়ছে। আমেরিকায় বসবাসরত চীনা অভিবাসী ও চীনাদের মতো চেহারার লোকজনকে এশীয়-আমেরিকান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। করোনার সংক্রমণ শুরু হলে ট্রাম্প এই ভাইরাসকে ‘চায়না ভাইরাস’ বলে অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ লোকজনের একটি অংশের বদ্ধমূল ধারণা হলো, এই ভাইরাস চীন থেকে দেশটির লোকজনের মাধ্যমে আমেরিকায় এসেছে।

ট্রাম্প এই ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য চীনকে দায়ী করে একাধিকবার বক্তৃতা দিয়েছেন। ফলে আমেরিকার স্বল্প শিক্ষিত উগ্রবাদী লোকজনের বিদ্বেষের মুখে পড়তে হচ্ছে এশীয়-আমেরিকান পরিচয়ের লোকজনকে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নগরীতে ‘চায়না টাউন’ নামে বাণিজ্য এলাকার অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। নিউইয়র্কসহ সর্বত্র এই ধরনের লোকজন হামলার শিকার হচ্ছেন। নিউইয়র্কে এমন শতাধিক হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এশীয় আমেরিকানদের এখন একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে।

এনবিসি নিউজ এক সংবাদে বলেছে, গত ১২ মাসে আমেরিকায় এশিয়ানদের ওপর ৩ হাজার ৮০০টির বেশি বিদ্বেষপূর্ণ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় গত মঙ্গলবার তিনটি স্পা সেন্টারে এক দুর্বৃত্তের গুলিতে আট ব্যক্তি নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ছয়জন এশীয় নারী। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, এই হামলাকে বিদ্বেষপূর্ণ হামলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। তদন্ত চলছে। সবশেষ তথ্যে জানা গেছে, জর্জিয়ার পর হামলাকারী ফ্লোরিডায় হামলা চালাতে চেয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি বুধবার এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, এসব হামলার পেছনে ট্রাম্পের বেপরোয়া সব বক্তব্যের প্রভাব রয়েছে। ‘চায়না ভাইরাস’, ‘উহান ভাইরাস’ প্রভৃতি বলে বলে আমেরিকায় বসবাসরত এশিয়ান কমিউনিটিকে বিপন্ন করে তোলা হয়েছে।

জেন সাকি বলেন, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর প্রথম বক্তৃতায় এশিয়ান কমিউনিটির প্রতি এমন বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন।

মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও বিচার বিভাগ বুধবার চার পৃষ্ঠার একটি স্মারক প্রকাশ করেছে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই স্মারকে বলা হয়েছে, আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদীরা হামলার জন্য ওত পেতে রয়েছে। এসব হামলায় বিভিন্ন সংখ্যালঘু কমিউনিটি, অভিবাসী গোষ্ঠী আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আমেরিকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি ও রক্ষণশীল নৈরাজ্যবাদীদের উত্থানের ফলে বছরব্যাপী এমন হামলার আশঙ্কা করে সব মহলকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। উদারনৈতিক রাজনৈতিক নেতা, আইনপ্রণেতাসহ অনেকেই হামলার শিকার হতে পারেন। সরকারি স্থাপনাগুলোও আক্রান্ত হতে পারে বলে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।

গত বছরের ৩ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমেরিকার বিভক্ত সমাজের নগ্নরূপ বেরিয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের জায়গা হয়ে ওঠেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের উসকানিতে ক্যাপিটল হিলে হামলা চালায় এসব উগ্রবাদীরা। সেই হামলায় পাঁচজন নিহত হন। এই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দারা ভয়াবহ তথ্য পাচ্ছে।

নিউইয়র্ক, নিউ জার্সির মতো উদারনৈতিক অঙ্গরাজ্য থেকে কমপক্ষে ১০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁরা সরকারি কোনো না কোনো বাহিনীর সাবেক বা বর্তমান সদস্য। এসব লোকজন ট্রাম্পের উসকানিতে বেপরোয়া হন। ট্রাম্পের মতো এসব লোকজনও বিশ্বাস করেন, গত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জালিয়াতি করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোতে এসব উগ্রবাদীদের অবস্থান বেশ শক্ত। তারা সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যুক্ত থাকছে। এফবিআইসহ সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এসব লোকজনের ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখছে। তবে জনসমাজের সঙ্গে মিশে থাকা উগ্রবাদীদের চিহ্নিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য জটিল হয়ে উঠেছে। অনেকটা বাইরের জঙ্গিদের মতোই এসব উগ্রবাদীরা নীরবে-গোপনে সহিংস হয়ে উঠছে।

তিন দশক ধরে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী ভিন্ন বর্ণের অভিবাসীদের নিজেদের চেয়ে এগিয়ে যেতে দেখছে বেশ দ্রুততার সঙ্গে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বাণিজ্যে এমন পিছিয়ে পড়ার বিষয়টিকে মোকাবিলার জন্য এসব হতাশ লোকজন রাজনীতির সহজ উসকানির ফাঁদে পা দিচ্ছে।

ট্রাম্প এসব হতাশ লোকজনের আশার আলো হয়ে উঠেছেন। এসব উগ্রবাদীরা মনে করে, ট্রাম্পই তাদের রক্ষা করতে পারেন। ট্রাম্প নিজেও সচেতনভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ এসব লোকজনকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও নেওয়ার চেষ্টায় আছেন। পরিণামে মার্কিন সমাজ এখন মূল্য দিতে শুরু করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ