• ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং , ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২২শে সফর, ১৪৪৩ হিজরী

নৃত্যকলা হলো সংস্কৃতির যোগাযোগ বাহন

ভয়েস অফ বাংলাদেশ
প্রকাশিত মার্চ ১, ২০২১
নৃত্যকলা হলো সংস্কৃতির যোগাযোগ বাহন

নিউজ ডেস্কঃ  সংস্কৃতিকে যদি সভ্যতার নির্যাস রূপে কল্পনা করা হয়, তাহলে এই সংস্কৃতির চতুরঙ্গ হচ্ছে সাহিত্য-সংগীত, চিত্রকলা, নৃত্যকলা। এর মধ্যে আবার প্রাচীনতম ধারা নৃত্যকলা। মানুষের আবেগ প্রকাশ ও যোগাযোগের প্রাচীনতম বাহন।

আদিম মানুষের কাছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্য শ্রম ও সুকুমার কলার কোনো প্রভেদ ছিল না। আত্মপ্রকাশের সামগ্রিক রূপই ছিল নৃত্য। নৃত্য ছিল তাদের জীবনযাত্রা ও জীবিকা প্রণালির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আদিম নৃত্য রচিত হয়েছে জীবিকা প্রচেষ্টার সহায়ক হিসেবে এবং এর ফলে তাদের জীবিকা প্রয়াস সবল ও সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রাণীজগত্ থেকে এর ভঙ্গি অনুকরণ করা হতো। অপ-দেবতাকে তুষ্ট করতে, বৃষ্টি আবাহনে, রোগ নিরাময়ে, শিকারে যাওয়ার উন্মাদনা জাগাতে নৃত্য ছিল আদিম মানুষের যোগাযোগের প্রধান উপকরণ।

যোগাযোগের ক্ষেত্রটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন মানদণ্ডের নিরিখে যোগাযোগের শ্রেণিবিভাগ করা হয়ে থাকে। যোগাযোগের প্রধান তিনটি ধরন—আন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ, আন্তঃযোগাযোগ ও গণযোগাযোগ। নৃত্যের ক্ষেত্রে দুটি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ—আন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ এবং গণযোগাযোগ। একজন নৃত্যশিল্পী যখন হস্তমুদ্রা অঙ্গভঙ্গি সহযোগে বিভিন্ন ব্যবহারিক দিক তুলে ধরে নিজেকে প্রস্তুত করে—তখন নিজের মধ্যে যে চিন্তাভাবনা, রস এবং আত্মশক্তি তৈরি হয় সেটি হচ্ছে আন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ। এটা ব্যক্তির মধ্যকার যোগাযোগ প্রক্রিয়া অর্থাত্ আমরা যখন নিজের সঙ্গে নিজের যোগাযোগ করি তখন এই যোগাযোগের উত্পত্তি। জনসভা, উন্মুক্ত সেমিনার বা মঞ্চ, টেলিভিশন ইত্যাদিকে গণযোগাযোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। নৃত্যের ক্ষেত্রে এই গণযোগাযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ বহন করে। অর্থাত্ একজন নৃত্যশিল্পী যখন তার নৃত্য কোনো মঞ্চ বা অডিটোরিয়ামে প্রদর্শন করেন, তখন উপস্থিত দর্শক সরাসরি নৃত্যশিল্পীর নৃত্য দেখেন—এ থেকে নৃত্যশিল্পী ও দর্শকের মধ্যকার যে রস এবং ভাবের সঞ্চার হয় তাতেই নৃত্যে জনযোগাযোগ স্থাপিত হয়।

ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে যে যোগাযোগ ঘটে তা-ই অবাচনিক যোগাযোগ। নৃত্য একটি অবাচনিক যোগাযোগ। নৃত্যে যাবতীয় অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি, দৃষ্টিভেদ, হস্তমুদ্রা, নবরস যেমন শৃঙ্গার, করুণ, হাস্য, বীভত্স, আশ্চর্য, ভয়ানক, বীর, শান্ত—এই চিহ্ন বা মুদ্রার মাধ্যমে ভাব অনুভূতি ও নৃত্যের বিষয় উপস্থাপনা করা হয়ে থাকে। নৃত্যের যে লাস্য ও তাণ্ডব ধারা রয়েছে এগুলো শরীরের ধীর ও বীর গতির মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। মানুষের আবেগ কথায় যত না প্রকাশিত, এর চেয়ে বেশি প্রকাশিত হয় ক্রিয়ায়। অবাচনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুখের অভিব্যক্তি, চোখের চাহনি, হস্তমুদ্রা, পোশাক-পরিচ্ছদ অনেক বেশি অর্থবহ।

নৃত্যশিল্পী মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে সুখের অনুভূতি, দুঃখের অনুভূতি, হর্ষ, বিষাদ, আহ্বান অর্থাত্ নবরসের প্রতিটি রসই ব্যক্ত করে ভাবের সঞ্চার ঘটিয়ে যোগাযোগ স্থাপন করেন। কারো সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা প্রতিক্রিয়া জানার জন্য, প্রতিউত্তর জানার জন্য বা তার অনুভূতি জানার জন্য শ্রোতার চোখের দিকে তাকাই, কিন্তু নৃত্যশিল্পী তাঁর নিজের অনুভূতি, আবেগ, মায়া, ভাব প্রকাশের জন্য দর্শকের মনে ভাব ও রস সঞ্চারণের উদ্দেশ্যে দৃষ্টিভেদের ব্যবহার করে থাকেন। চাহনির মাধ্যমে অতি সহজেই দুই ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভৌত দূরত্ব অতিক্রম করা যায়; এতে অতি সহজেই নৃত্যশিল্পী তাঁর ভাব সঞ্চার করে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

হস্তমুদ্রাকে সাংকেতিক চিহ্ন অবশ্যই বলা যায়। আমরা কথা না বলেও হাত বা আঙুলের মাধ্যমে অনেক কিছু বোঝাতে পারি। নৃত্যে হস্তমুদ্রা অধিক ব্যবহূত হয়। এতে দর্শক সহজেই নৃত্যের মূলভাব বুঝতে পারেন এবং নৃত্য অর্থবহ হয়ে ওঠে।

অর্থবহ নৃত্য ও অঙ্গভঙ্গি সময় নিবেদিত। নাচের সম্প্রদায়গুলো ও মুদ্রাগুলো অর্থবহ। নাচ আত্মা থেকে উদ্ভুত অর্থবহ অঙ্গভঙ্গি সমন্বিত একটি উত্সর্গীকৃত সংস্কৃতি। নাচ কেবল বিনোদন হিসাবে নয়, যোগাযোগ হিসাবেও অধিক প্রযোজ্য। নাচকে শৈল্পিক প্রকাশের অর্থ হিসাবে তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে কৌশল, স্ট্যামিনা, শৃঙ্খলা এবং সৃজনশীলতা জড়িত। তবে নাচ পারফর্মিং আর্টগুলির মধ্যে একটি, যাতে স্ট্যামিনা অনেক অনেক বেশি। অর্থপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি ছাড়া নাচ অর্থবহ হয় না। নাচ শুধু সংগীত দ্বারা চালিত নয় বরং শরীর এবং আত্মা দ্বারা চালিত। নাচের মধ্যে পুরো শরীর জড়িত এবং শরীর যোগাযোগের একটি শক্তিশালী এজেন্ট হতে পারে। নৃত্য শারীরিক শক্তির কথোপকথনকে আরো আধ্যাত্মিক করে তোলে। যা কিছু আত্মার বাইরে তা নৃত্যশিল্পীর আত্মার অনিবার্য প্রকাশের সঙ্গে আবদ্ধ হয়।

কিছু কিছু ধর্মে জীবনযাপন ও নাচ আলাদা কোনো বিষয় নয়। মনিপুরী সম্প্রদায়ের কাছে সৃষ্টিকর্তার আরাধনার একমাত্র মাধ্যম এই নাচ। পরিশেষে আমরা এই বিষয়ে উপনীত হতে পারি যে, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় আবাচনিক উপাদান হিসেবে নৃত্য অন্যতম মাধ্যম।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১