ঘর সাজাতে কাচে আঁকা ছবি

প্রকাশিত: ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২১

ঘর সাজাতে কাচে আঁকা ছবি

তানিয়া ফেরদৌসঃ

নিজেকেই হোক আর নিজের প্রিয় গৃহকোণই হোক, একটু অন্য রকমভাবে সাজাতে আমরা সব সময়ই সচেষ্ট থাকি। ঘরের দেয়াল তো কত কিছু দিয়ে কত রকমভাবেই সাজানো যায়। কিন্তু হিজিবিজি-এলোপাতাড়ি একগাদা ছবি আর ওয়াল পিস দিয়ে দেয়াল ভিড় করে ফেললে তা আসলে মোটেই রুচিকর দেখায় না, তা সে ওয়াল হ্যাঙ্গিংগুলো যতই দামি আর বিদেশ থেকে আনা হোক।

বসার ঘর, শোয়ার ঘর, এমনকি যেসব করিডর বা সিঁড়িঘরে পর্যাপ্ত আলো পড়ে, সে জায়গার দেয়ালগুলো অভিনব সব গ্লাস পেইন্টিং দিয়ে সাজানোর ধারণাটি এখন সারা বিশ্বে খুব জনপ্রিয়। গতানুগতিক প্রাকৃতিক দৃশ্য ছাড়াও কাচের পটে আঁকা হাল আমলের ফ্যাশনেবল পপ আর্ট বা কয়েকটি মিনি পোর্ট্রেটের সমন্বয় করে যেকোনো দেয়ালকে দেওয়া যায় এক নতুন মাত্রা। ঘরের বাতি ও জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো কোন দিকে কীভাবে পড়ে, তার সঙ্গে সংগতি রেখে গ্লাস পেইন্টিং নির্বাচন করলে ও সেমতো সঠিক স্থানে সাজালে ঘরে নয়নাভিরাম একটি আবহ তৈরি হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এই কাচে আঁকা ছবি সবার কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এর আছে অত্যন্ত প্রাচীন ইতিহাস।হাজার বছরের পুরোনো এই শিল্পের বিকাশ ইউরোপীয় দেশগুলোতেই প্রথমে ঘটেছিল বলে জানা যায়। নবম শতকে জার্মানিতে উদ্ভাবিত এই গ্লাস পেইন্টিংয়ের কদর সতেরো শতকের দিকে একেবারে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। তখন চার্চ, ক্যাথেড্রাল, চ্যাপেলসহ বিভিন্ন খ্রিষ্টধর্মীয় স্থাপনায় জানালার কাচে করা থাকত রঙিন আঁকিবুঁকি। সে কাচ চিত্রে বিভিন্ন বিমূর্ত শিল্পকলানির্ভর নকশার সঙ্গে সঙ্গে বাইবেলের গল্পের বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রায়িত করা হতো জনসাধারণের কাছে ধর্মের বাণী পৌঁছে দিতে। বিভিন্ন রঙিন কাচের অংশ তাপ দিয়ে রাঙিয়ে বা ঝালাই করে পাশাপাশি সাজিয়ে এ কাজগুলো করা হতো। একে মূলত স্টেইন্ড গ্লাস আর্ট বলা হয়।

ষোলো শতকে যখন বিচিত্র রঙের এনামেল পেইন্ট আবিষ্কার করা হলো, তখন কাচের চিত্রশিল্পের উৎকর্ষ একেবারে শিখরে উঠে গেল। এরপর ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি ইউরোপীয় দেশে গ্লাস পেইন্টিংয়ের বহুল প্রচলন ঘটে। ভ্যাটিকান সিটির বিভিন্ন প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনায় গ্লাস পেইন্টিংয়ের মোহময় সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছরই অনেক পর্যটক ভিড় করেন সেখানে। এ ছাড়া প্রকৃত তুলির কারুকাজে কাচের পটে আঁকার ধারণাটি কিন্তু চীন দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

প্রথম দিকে পাশ্চাত্য ধারার কাজ হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে রিভার্স গ্লাস পেইন্টিংয়ের কায়দায় আঁকা চীনা শিল্পীদের অপূর্ব সব প্রাকৃতিক দৃশ্য আর ইতিহাসের গল্পগাথা আঁকা কাচচিত্র সবার কাছে খুব সমাদৃত হয়ে উঠল। আমাদের উপমহাদেশেও কিন্তু এই চীনের সমসাময়িক সময়ে গ্লাস পেইন্টিংয়ের বেশ প্রচলন ঘটে। বহু প্রাচীন জমিদারবাড়ি ও রাজপ্রাসাদে জমিদার ও রাজরাজড়াদের কাচে আঁকা পোর্ট্রেট দেখা যায়। তবে ধারণা করা যায়, ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়দের দ্বারাই এর প্রসার ঘটে আমাদের এ অঞ্চলে। বিভিন্ন স্থানীয় ফোক আর্টেরও কাচে আঁকা রূপ খুঁজে পাওয়া যায় ভারতের বিভিন্ন জায়গায়আমাদের দেশে গ্লাস পেইন্টিংয়ের ধারণাটি বেশ নতুন। এ দেশে ইউরোপীয় স্টেইন্ড গ্লাস টেকনিকে গ্লাস পেইন্টিংয়ের কারিগর খুব বেশি নেই। টাইলসের মতো বা বড় আকারে কাচে মেশিনে পেইন্ট করা কিছু ইন্টেরিয়র সামগ্রী স্বল্প পরিসরে আমদানি করা হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদেশ থেকে আনা বিভিন্ন গ্লাস পেইনে পেইন্টিং করা থাকে আগের থেকেই। বিভিন্ন বিলাসবহুল বাড়ি বা স্থাপনায় জানালা বা ঘরের সিলিংয়ে ব্যবহার হয় এগুলো। তবে কাচের পটে অ্যাক্রিলিক পেইন্ট ব্যবহার করে আঁকা ছবি দিয়ে ঘর সাজানোর ধারণাটি এখন ক্রমেই আগ্রহ বাড়াচ্ছে আমাদের।